বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়াতে দেশীয় প্রযুক্তিতে পাঁচটি রিভারাইন পেট্রোল ভেসেল নির্মাণের কিল-লেয়িং সম্পন্ন হয়েছে, যা প্রতিরক্ষা শিল্পে আত্মনির্ভরতার নতুন মাইলফলক।
১৭ জুন ২০২৬ তারিখে ডকইয়ার্ড এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের জন্য অত্যাধুনিক পাঁচটি রিভারাইন পেট্রোল ভেসেল বা আরপিভি নির্মাণের আনুষ্ঠানিক কিল-লেয়িং কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জনাব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিতিতে এই প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়, যেখানে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নেন বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার এডমিরাল মো. জিয়াউল হক।
মূলত দেশের উপকূলীয় সুরক্ষা ও নদীপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই বিশেষ নৌযানগুলো নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ডিইডব্লিউর নিজস্ব কারিগরি দক্ষতা ও প্রকৌশলগত সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা জাতীয় প্রতিরক্ষা খাতের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা প্রদর্শনের একটি বড় সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই জাহাজগুলোর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে তা কোস্টগার্ডের বহরে নতুন শক্তির সঞ্চার করবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।
প্রতিটি আরপিভি ৩৮.৫ মিটার দৈর্ঘ্য, ৭.৯০ মিটার প্রস্থ এবং ২.৪৫ মিটার গভীরতার বিশদ নকশায় তৈরি করা হচ্ছে, যার ডিসপ্লেসমেন্ট ক্ষমতা ২৩২ টন। এই নৌযানগুলো ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৫ মাইল গতিতে সমুদ্র ও নদীর উত্তাল তরঙ্গে ছুটে চলতে সক্ষম, যা চোরাচালান বিরোধী অভিযান ও অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে অত্যন্ত কার্যকর হবে।
জাহাজগুলোতে অত্যাধুনিক নেভিগেশন র্যাডার, জিপিএস এবং নাইট ভিশন প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো হয়েছে, যা প্রতিকূল আবহাওয়া ও রাতের অন্ধকারেও নির্ভুলভাবে দায়িত্ব পালনে সহায়তা করবে। এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ফলে কোস্টগার্ডের সদস্যরা নদী ও মোহনা এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে টহল ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে পারবেন।
ভুক্তভোগী বা দুর্গম এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এই ভেসেলগুলো গেম চেঞ্জার হিসেবে কাজ করবে বলে প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন। আধুনিক প্রযুক্তির এই সংযোজন উপকূলীয় অপরাধ দমনে কোস্টগার্ডের বর্তমান সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সহায়ক হবে।
ডিইডব্লিউর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত মেড ইন বাংলাদেশ নীতির আলোকে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে এই জাহাজগুলো তৈরি করা হচ্ছে, যা বৈদেশিক নির্ভরতা কমিয়ে প্রতিরক্ষা শিল্পে আত্মনির্ভরতা অর্জনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের অপারেশনাল সক্ষমতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে এবং এটি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও সুসংহত করবে।
কর্তৃপক্ষের মতে, এই ধরনের প্রজেক্ট পরিচালনা করার ফলে স্থানীয় প্রকৌশলী ও কারিগরদের দক্ষতার উন্নয়ন ঘটছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের জাহাজ নির্মাণের পথ প্রশস্ত করবে। যদিও বর্তমানে এই প্রকল্পের নির্মাণাধীন অবস্থা নিয়ে কোনো চ্যালেঞ্জের কথা জানানো হয়নি, তবে সময়মতো জাহাজগুলো কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে ডকইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রকল্পের মান নিয়ন্ত্রণ ও টেকসই নির্মাণ নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি বজায় রাখার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
পরিশেষে, এই পাঁচটি রিভারাইন পেট্রোল ভেসেল নির্মাণ কেবল একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। নদীমাতৃক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি চলমান ও চ্যালেঞ্জিং প্রক্রিয়া, যেখানে এই ধরনের আধুনিক নৌযানের উপস্থিতি অপরিহার্য।
এই প্রকল্পের সফল সমাপ্তি ঘটলে তা কেবল কোস্টগার্ডের সক্ষমতাই বাড়াবে না, বরং ভবিষ্যতে দেশের সমুদ্র ও নদীপথের সুরক্ষায় নিজস্ব প্রযুক্তির ব্যবহারকে আরও উৎসাহিত করবে। সাধারণ মানুষের যাতায়াত নিরাপত্তা এবং অবৈধ কর্মকাণ্ড রোধে এই নৌযানগুলো দীর্ঘমেয়াদী সুফল বয়ে আনবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন। দেশীয় শিল্পের এই বিকাশ জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।