আমাদের সুন্দরবন সফর ছিল তিন দিনের। আমাদের সেশনের সবাই এই সফরে অংশ নিয়েছিলাম। তবে ম্যাম আমাদের কয়েকটি গ্রুপে ভাগ করে দিয়েছিলেন। আমাদের দলে মোট ১০ জন শিক্ষার্থী ছিলাম—আমি, সাদিয়া, সুমাইয়া, সামান্তা, লাবণী, মৌমিতা, রাফি, দিপ্ত হাসিব, মেহেজাবিন ও সানজিদা। আমাদের সঙ্গে ছিলেন দুইজন নির্দেশক ম্যাম।
সফরের উদ্দেশ্যে আমরা ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৫টায় রওনা দিই এবং ৭ জানুয়ারি রাতের দিকে ফিরে আসি।

প্রতিটি দিনই ছিল নতুন কিছু শেখা ও নতুন কিছু দেখার অভিজ্ঞতায় ভরপুর। তবে শেষ দিনের অভিজ্ঞতা ছিল একেবারেই আলাদা—হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। জরিপ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আমরা বাগেরহাট জেলার সুন্দরবনের করমজল সংলগ্ন একটি জেলেপল্লিতে পৌঁছাই। গ্রামের নাম ঢাংমারী। মোংলা বন্দর থেকে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই জনপদটি যেন অবহেলা ও বঞ্চনার এক নীরব দলিল।
গ্রামে প্রবেশ করতেই বোঝা যায়, এখানকার মানুষের জীবন কতটা সংগ্রামী। বাইরে থেকে কেউ এলে তাদের চোখে ভেসে ওঠে এক ধরনের আশা—কেউ বুঝি সাহায্য নিয়ে এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। যাদের সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের কাছেই সাহায্য খুব কমই পৌঁছে।
ঢাংমারীর মানুষের খাবার ও পানির প্রধান উৎস হলো বৃষ্টির পানি। সারা বছর তারা বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখে এবং সেটুকুই পানীয় হিসেবে ব্যবহার করে। শীতকালে অনেকেরই পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র থাকে না। জীবিকা নির্বাহের প্রধান উপায় মাছ ধরা ও সামান্য চাষাবাদ। তবে লবণাক্ত মাটির কারণে চাষাবাদের সুযোগও অত্যন্ত সীমিত।
সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো কুমিরের ভয়। আমরা এমন একজন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছি, যিনি মাছ ধরার সময় কুমিরের আক্রমণে আহত হয়েছিলেন। ভাগ্যক্রমে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু এরপর চিকিৎসার জন্য আশপাশে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় তাকে দূরের মোংলা শহরে যেতে হয়েছে, যা অনেকের জন্য প্রায় অসম্ভব।
শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থাও করুণ। গ্রামের স্কুলে সর্বোচ্চ পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। তাও আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অনেক শিশু এই সামান্য সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়। ফলে খুব অল্প বয়সেই তাদের জীবিকার ভার কাঁধে তুলে নিতে হয়।
চরম দারিদ্র্য ও বন্যপ্রাণীর আতঙ্ক—এই দুইয়ের মধ্যেই প্রতিদিন কাটে ঢাংমারীর মানুষের জীবন। দুঃখজনকভাবে, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মহল তাদের অবমাননাকরভাবে “সুন্দরবনের বানর” বলে অভিহিত করে।
ঢাংমারীর মানুষের জীবনকাহিনি শুধু করুণ নয়, এটি আমাদের সমাজের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। উন্নয়ন ও সভ্যতার আলো থেকে বহু দূরে থাকা এই জনপদ আজও অপেক্ষায়—মানবিক সহানুভূতি, মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় সহায়তার।
লেখা:
অর্পিতা শীল
শিক্ষার্থী, প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
সেশন: ২০২২-২০২৩