সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে প্রশ্নফাঁস, জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগে দেশজুড়ে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত এসব অভিযোগের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। একই সঙ্গে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব এড়িয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যেই পরীক্ষার ফল প্রকাশের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
ডিপিইর পলিসি অ্যান্ড অপারেশন বিভাগের পরিচালক এ কে মোহাম্মদ সামছুল আহসান জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরীক্ষার ফল প্রকাশের তারিখ নিয়ে যেসব তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তার কোনো ভিত্তি নেই। সোমবার গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ফল প্রকাশের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফেসবুকে প্রচারিত বিভিন্ন তারিখ ও বিজ্ঞপ্তি সম্পূর্ণ গুজব। তবে পরীক্ষার ফল যেন অযথা দেরি না হয়, সে জন্য অধিদপ্তর সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছে।
তিনি আরও জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণার কারণে ৩ জানুয়ারির নির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিল। পরে ৯ জানুয়ারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় এক সপ্তাহ সময় পিছিয়েছে। এ বিষয়ে মহাপরিচালক স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন—ফল প্রকাশে যেন কোনো অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব না হয়।
ভুয়া বিজ্ঞপ্তি ছড়ানোর অভিযোগ
ডিপিইর এই কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে আতঙ্ক তৈরি করছে। তার নাম ও স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। কোথাও কোথাও তার নাম ভুলভাবে লেখা হয়েছে, যা থেকেই বোঝা যায় এগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব।
প্রশ্নফাঁস নয়, ডিভাইস ব্যবহার করে নকল
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও প্রশ্নফাঁসের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে ডিপিইর মহাপরিচালক (ডিজি) আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, প্রশ্নফাঁসের চেষ্টা হয়েছিল—এ কথা অস্বীকার করা হচ্ছে না। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে প্রশ্ন উদ্ধার করেছে, সেগুলোর সঙ্গে মূল প্রশ্নপত্রের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। ফলে প্রশ্নফাঁস হয়নি বলেই প্রতীয়মান হয়।
তবে তিনি স্বীকার করেন, পরীক্ষায় ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে নকলের চেষ্টা হয়েছে। তার ভাষায়, ডিভাইস ব্যবহারের অর্থ প্রশ্নফাঁস নয়। এ অভিযোগে ২০৭ জন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় মামলা হয়েছে এবং কেউ কেউ শাস্তিও পেয়েছে। এত বড় পরিসরের একটি পরীক্ষায় প্রতারকচক্র সক্রিয় হওয়া অস্বাভাবিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তদন্তের আশ্বাস, প্রমাণ মিললে বাতিল
চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অভিযোগগুলো তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। মহাপরিচালক জানান, চাকরিপ্রার্থীরা পরীক্ষা বাতিলের যে দাবি তুলেছেন, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে পরীক্ষা বাতিল করা হবে। আর যদি কোনো অনিয়মের প্রমাণ না মেলে, তাহলে নিয়ম অনুযায়ী ফল প্রকাশ করা হবে।
চাকরিপ্রার্থীদের প্রতিবাদ
এর আগে রোববার রাজধানীর মিরপুরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রধান ফটকে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন একদল চাকরিপ্রার্থী। তারা প্রশ্নফাঁস, অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ তুলে পাঁচ দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
একজন আন্দোলনকারী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন মিলিয়ে দেখার পর তাদের সন্দেহ আরও বেড়েছে। তারা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত চান। প্রশ্নফাঁস প্রমাণিত হলে পরীক্ষা বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা নেওয়ার দাবিও জানান তিনি। আরেক পরীক্ষার্থীর মতে, যেভাবে ডিভাইসভিত্তিক চক্র সক্রিয় ছিল, তাতে সাধারণ পরীক্ষার্থীরা বড় ধরনের বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। ফল প্রকাশের আগে সব অভিযোগ পরিষ্কার করা জরুরি।
স্বচ্ছতার গুরুত্ব
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ও ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বড় নিয়োগ পরীক্ষায় স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ফল প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়; পুরো প্রক্রিয়াই এমন হতে হবে, যাতে পরীক্ষার্থীদের মনে কোনো সন্দেহ বা প্রশ্ন না থাকে।
উল্লেখ্য, গত ৯ জানুয়ারি বিকাল ৩টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা বাদে দেশের ৬১ জেলায় একযোগে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন ১০ লাখ ৮০ হাজারের বেশি চাকরিপ্রার্থী। পরীক্ষার আগেই সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের গুজব ছড়িয়ে পড়লে তা দেশজুড়ে বিতর্ক ও আন্দোলনের জন্ম দেয়।