ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে আরেকটি বছর পেছনে পড়ে রইল। বিদায় নিল ২০২৫—যে বছরটি বাংলাদেশের ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক চাপ এবং গভীর শোকের বছর হিসেবে।
২০২৫ সালজুড়ে দেশ ছিল এক ধরনের অচলাবস্থার মধ্যে। অন্তর্বর্তী সরকার এবং প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ভূমিকা নানা সময়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে দেশকে। বছরজুড়ে একের পর এক আন্দোলন, দাবি আদায়ের কর্মসূচি আর রাজপথকেন্দ্রিক কর্মতৎপরতা জনজীবনকে বারবার ব্যাহত করেছে। সামান্য ঘটনাতেই রাস্তায় নামার প্রবণতা যেন স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হয়েছিল।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল ঘটে। এর প্রভাব পড়ে জনসেবায়—গতি কমে যায় প্রশাসনিক কার্যক্রমের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বিভিন্ন সময়ে। চর দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব এবং তার জেরে মব সন্ত্রাস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এই অস্থিরতার মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা দেয়, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে এই নির্বাচনই ছিল দেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। নির্বাচন হবে কি না—এই সংশয় মানুষের মনে দীর্ঘদিন ছিল। তবে নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণার পর সেই অনিশ্চয়তা অনেকটাই কাটে। দেশজুড়ে ধীরে ধীরে তৈরি হতে শুরু করে নির্বাচনী আবহ।
তবে তফসিল ঘোষণার পরপরই ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার ঘটনা দেশকে নাড়া দেয়। এই হত্যাকাণ্ড স্পষ্ট করে দেয়, একটি গোষ্ঠী দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করে নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টায় লিপ্ত।
বছরের শেষভাগে ঘটে যায় দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত ঘটনা। একদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অন্যদিকে দীর্ঘ আঠারো মাস কারাভোগ এবং প্রায় সতেরো বছর প্রবাসে কাটানোর পর ২৬ ডিসেম্বর সপরিবারে দেশে ফেরেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নেতার প্রত্যাবর্তনে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা দেখা দেয়।
কিন্তু সেই আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বছরের শেষের একেবারে প্রাক্কালে জাতি হারায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে। তার মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে গোটা দেশ। বছরের শেষ দিনে অনুষ্ঠিত তার জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে—তিনি কতটা গভীরভাবে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন।
এইসব ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়েই যাত্রা শুরু করেছে ২০২৬। বাংলাদেশের জন্য বছরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই বছরেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিগত আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচনের পর এবারের ভোটে জনগণ নিজের ভোট নিজে দেওয়ার সুযোগ পাবে—এমন আশ্বাস দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন।
জনগণের প্রত্যাশা, একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসবে নতুন সরকার। সেই সরকার হবে জনরায়ে নির্বাচিত, জনমুখী এবং জবাবদিহিমূলক। ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ চায়—নতুন সরকার যেন জনকল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয় এবং বাংলাদেশকে স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।